Lesson 5
বিবাহবিচ্ছেদে যে শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীই পৃথক হন তা নয়, সন্তানেরাও বাবা-মায়ের সংস্পর্শ হারায়। বিবাহবিচ্ছেদের দুঃখজনক ফলাফলগুলি হলত্প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রীদের তিক্ততা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, এবং বিভ্রান্ত সন্তানদের জীবন। এ ঘটনা কখনই আপনার পরিবারে ঘটতে দেবেন না! আপনার দাম্পত্য জীবনে যতই বিঘ্ন আসুক কিংবা সুখের জোয়ার বয়ে যাক না কেনত্নতুবা আপনি যদি এখনও বিবাহ না করে থাকেন কিন্তু বিবাহ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেনত্বাইবেল আপনার দাম্পত্য জীবনকে দীর্ঘস্থায়ী হতে সহায়তা করার জন্য প্রমাণসম্বলিত নির্দেশমালা দেয়। এটি সেই ঈশ্বর থেকে আগত উপদেশ, যিনি বিবাহের সূচনা এবং একে অভিষিক্ত করেছেন! যদি আপনার সব প্রচেষ্টা বিফল হয়ে থাকে, কেন তাঁকে একটিবার সুযোগ দিচ্ছেন না?
১৭টি চাবিকাঠি যা আপনার দাম্পত্য জীবনকে আরও সুখময় করবে:
1. আপনার নিজের একটি ব্যক্তিগত গৃহ প্রতিষ্ঠা করুন।
“মনুষ্য আপন পিতা মাতাকে ত্যাগ করিয়া আপন স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, এবং তাহারা একাঙ্গ হইবে” (আদিপুস্তক ২:২৪)।

মন্তব্যঃ ঈশ্বরের পরিকল্পনানুসারে বিবাহের পর নতুন দম্পতি বাবা-মাকে ত্যাগ করে নিজেরাই নিজেদের গৃহ প্রতিষ্ঠা করবে। যদি অর্থ কম থাকে তবে প্রয়োজনে ছোট ঘরের ব্যবস্থা করবে। স্বামী–স্ত্রী উভয়ে মিলে, এক হয়ে, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে, এবং যদি কেউ এর বিরোধিতাও করে তবু তাদের দৃঢ় থাকতে হবে। যদি এই নীতিমালা যত্নের সঙ্গে পালন করা হতো তবে অনেক দাম্পত্য জীবনই উন্নততর হতো।
2. প্রনয়ভাব বজায় রাখুন!
“সর্ব্বাপেক্ষা পরস্পর একাগ্রভাবে প্রেম কর, কারণ প্রেম পাপরাশি আচ্ছাদন করে,
(১ পিতর ৪:৮)। “তাঁহার স্বামীও ... তাঁহার এইরূপ প্রশংসা করেন” (হিতোপদেশ ৩১:২৮)।
“বিবাহিতা স্ত্রী ... চিন্তা করে, কিরূপে স্বামীকে সন্তুষ্ট করিবে” (১ করিন্থীয় ৭:৩৪)।
“পরস্পর স্নেহশীল হও ... সমাদরে একজন অন্যকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কর” (রোমীয় ১২:১০)।
মন্তব্যঃ বৈবহিক জীবনেত্প্রণয়ভাবকেত্ধরে রাখুন। সফল বিবাহিত জীবন আপনা-আপনি ঘটে না; এটি গড়তে হয়। একে অন্যকে শুধুমাত্র বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ দুটি মানুষ হিসাবে ভাববেন না নতুবা সেই একঘেয়েমিভাব আপনার দাম্পত্য জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একে অপরের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করে ভালবাসা বর্ধিষ্ণু রাখুন; অন্যথায়, প্রেম শিথিল হয়ে গিয়ে আপনাদের দু’জনকে পৃথক করে দিতে পারে। নিজের জন্য ভালোবাসা এবং সুখ অন্বেষণ করে পাওয়া যায় না, কিন্তু অন্যকে সেটি দেয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায়। তাই যতটা সম্ভব একত্রে বিভিন্ন কাজ করে অধিক সময় ব্যয় করুন। একে অন্যকে প্রাণবন্তভাবে শুভেচ্ছা জানানো অভ্যেস করুন। নিরুদ্বেগ থাকুন ভ্রমণে যান, দর্শনীয় স্থানে যান, এবং একত্রে আহার করুন। ছোট-ছোট সৌজন্য, উত্সাহদান, এবং সস্নেহ কাজগুলো উপেক্ষা করবেন না। একে অন্যকে ছোট খাট উপহার দিয়ে কিংবা উপকার করে উভয়ের জীবনে আনন্দ বয়ে আনুন। একে অপরকে “ভালোবাসায় ছাপিয়ে” যেতে চেষ্টা করুন। আপনার দাম্পত্য জীবনে আপনি যতটুকু বিনিয়োগ করবেন তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন পরস্পরের প্রতি ভালবাসার কমতি হলো দাম্পত্য জীবন ধ্বংসের বৃহত্তম কারণ।
3. মনে রাখবেন ঈশ্বর আপনাদের দুজনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।
“এই কারণ মনুষ্য পিতা ও মাতাকে ত্যাগ করিয়া আপন স্ত্রীতে আসক্ত হইবে। ... সুতরাং তাহারা আর দুই নয়, কিন্তু একাঙ্গ। অতএব ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার বিয়োগ না করুক” (মথি ১৯:৫, ৬)।
মন্তব্যঃ আপনার গৃহ থেকে প্রেম কি ধীরে ধীরে উধাও হতে শুরু করেছে? যদিও বা শয়তান আপনাকে হাল ছেড়ে দিতে প্রলুব্ধ করার মাধ্যমে আপনার দাম্পত্য জীবনকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, ভুলে যাবেন না যে ঈশ্বর নিজে আপনাদের বিবাহে আবদ্ধ করেছেন। এবং তিনি চান আপনারা একত্রে থেকে সুখি হন। আপনারা যদি তাঁর ঐশী আজ্ঞাগুলো মেনে চলেন তিনি আপনাদের জীবনে সুখ এবং ভালোবাসা নিয়ে আসবেন। তাইতো সদাপ্রভু বলেছেন, “ঈশ্বরের সকলই সাধ্য” (মথি ১৯:২৬)। নিরাশ হবেন না। যদি আপনি ঈশ্বরের কাছে যাচ্ঞা করেন এবং তাঁকে অনুমতি দেন তবে তাঁর আত্মা আপনার ও আপনার জীবন সঙ্গীর মন পরিবর্তন করতে পারেন।

4. আপনার চিন্তা ভাবনাকে নিয়ন্ত্রন করুন।
“সে অন্তরে যেমন ভাবে, নিজেও তেমনি” (হিতোপদেশ ২৩:৭)। “তোমার ... প্রতিবাসীর স্ত্রীতে ...
লোভ করিও না” (যাত্রা ২০:১৭)। “তোমার হৃদয়
রক্ষা কর, কেননা তাহা হইতে জীবনের উদ্গম হয়”
(হিতোপদেশ ৪:২৩)। “যাহা যাহা সত্য ... আদরণীয় ...
ন্যায্য ... বিশুদ্ধ ... প্রীতিজনক ... সুখ্যাতিযুক্ত সেই
সকল আলোচনা কর” (ফিলিপীয় ৪:৮)।
মন্তব্যঃ ভুল ধরনের চিন্তা-ভাবনা আপনার দাম্পত্য জীবনে চরম ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। শয়তান আপনার মনে এ ধরনের চিন্তা এনে আপনাকে প্রলুব্ধ করবে, “আমাদের বিবাহ করা ভুল হয়েছে,” “আমার স্ত্রী আমাকে বোঝে না,” “আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে,” “প্রয়োজন হলে আমরা বিবাহ-বিচ্ছেদ করবো,” “আমি বাড়িতে আমার মায়ের সঙ্গে থাকবো,” কিংবা, “সে ঐ মহিলার দিকে তাকিয়ে হেসেছে।” এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা করা বিপজ্জনক কারণ পরিশেষে আপনার চিন্তারাশিই আপনার কার্যকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এমন ধরনের কোনও কিছু দেখা, বলা, পড়া, কিংবা শোনা এড়িয়ে চলুন যাত্কিংবা এমন কারও সঙ্গে মেলা-মেশা করা এড়িয়ে চলুন যেত্অবিশ্বস্ত হতে পরামর্শ দেয়। অনিয়ন্ত্রিত চিন্তা-ভাবনা এমন একটি গাড়ির মতো যেটিকে একটি খাড়া পাহাড়ের গায়ে নিউট্রাল গিয়ার দিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে; যার পরিণাম ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
5. একে অপরের সঙ্গে রাগান্বিত অবস্থায় কখনই ঘুমাতে যাবেন না।
“সূর্য অস্ত না যাইতে যাইতে তোমাদের কোপাবেশ শান্ত হউক” (ইফিষীয় ৪:২৬)। “একজন অন্য জনের কাছে আপন আপন পাপ স্বীকার কর” (যাকোব ৫:১৬)। “পশ্চাৎ স্থিত বিষয় সকল ভুলিয়া গিয়া” (ফিলিপীয় ৩:১৩)। “তোমরা পরস্পর মধুর স্বভাব ও করুণচিত্ত হও, পরস্পর ক্ষমা কর, যেমন ঈশ্বরও খ্রীষ্টে তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন” (ইফিষীয় ৪:৩২)।

মন্তব্যঃ কোনও প্রকার মনোকষ্ট এবং অভিযোগত্সে ছোট হোক কিংবা বড় হোকত্তা নিয়ে রাগান্বিত থাকা বিপজ্জনক হতে পারে এবং আপনার দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরাতে পারে। এমনকি ছোট-ছোট সমস্যাগুলোও, যদি সময়োপযোগী পদ্ধতিতে মোকাবিলা করা না হয়, আপনার মনের ভেতর অপরাধবোধ হিসেবে গেঁথে থাকতে পারে এবং জীবনের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গীকে খারাপভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এজন্যই ঈশ্বর বলেছেন যেনা ঘুমোতে যাবার আগেই আপনি আপনার রাগ শান্ত হতে দেন। ক্ষমা করার জন্য এবং “আমি দুঃখিত,” এ কথা বলার জন্য প্রস্তুত থাকুন। সর্বোপরি, কেউই নিখুঁত নয়, তাছাড়া, আপনারা দু’জনেই ত একই দলে আছেন, এইজন্য যখন আপনি কোনও ভুল করেন তখন ক্ষমা চাইতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। এছাড়াও, অসাধারণ ক্ষমতা ব্যবহার করে বিবাহ সঙ্গীদের পরস্পরের কাছাকাছি টেনে এনে মিলন করিয়ে দেয়া একটি খুবই সুখকর অভিজ্ঞতা। স্বয়ং ঈশ্বর এটি করার পরামর্শ দিয়েছেন! এটি একটি কার্যকরী পদ্ধতি!

6. খ্রীষ্টকে আপনার গৃহের কেন্দ্রবিন্দু করুন।
“যদি সদাপ্রভু গৃহ নির্মাণ না করেন, তবে নির্মাতারা বৃথাই পরিশ্রম করে” (গীতসংহিতা ১২৭:১)। “তোমার সমস্ত পথে তাঁহাকে স্বীকার কর; তাহাতে তিনি তোমার পথ সকল সরল করিবেন” (হিতোপদেশ ৩:৬)। “তাহাতে সমস্ত চিন্তার অতীত যে ঈশ্বরের শান্তি, তাহা তোমাদের হৃদয় ও মন খ্রীষ্ট যীশুতে রক্ষা করিবে” (ফিলিপীয় ৪:৭)।
মন্তব্যঃ এ নীতিটিই হলো সর্ববৃহত্ নীতি, কারণ এটিই অন্যান্য নীতিগুলোকে সক্রিয় করে। একটি গৃহে সুখ আনার উপাদানগুলো কূটনীতি, কৌশল, কিংবা সমস্যাগুলো জয় করার প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে, বরং খ্রীষ্টের সঙ্গে আমাদের যুক্ত হওয়ার উপর নির্ভর করে। যে দু’টি হৃদয় খ্রীষ্টের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ থাকবে তারা বেশিক্ষণ বিচ্ছিন্ন দূরে সরে থাকতে পারে না। গৃহে খ্রীষ্ট থাকলে, সেই দাম্পত্য জীবন সফল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যীশু আমাদের মনের সমস্ত তিক্ততা ও হতাশাকে দূর করে সেখানে ভালোবাসা ও সুখে ভরে দিতে পারেন। বৈবাহিক সম্পর্কে এনে দিতে পারেন এক নতুন যাত্রা। জীবন আনন্দে ভরিয়ে এবং উভয়ের সম্পর্ক দৃঢ়তর করে দিতে পারেন।
7. একত্রে প্রার্থনা করুন।
“জাগিয়া থাক, ও প্রার্থনা কর, যেন পরীক্ষায় না পড়; আত্মা ইচ্ছুক বটে, কিন্তু মাংস দুর্বল” (মথি ২৬:৪১)। “একজন অন্য জনের নিমিত্ত প্রার্থনা কর” (যাকোব ৫:১৬)। “যদি তোমাদের কাহারও জ্ঞানের অভাব হয়, তবে সে ঈশ্বরের কাছে যাচ্ঞা করুক; তিনি সকলকে অকাতরে দিয়া থাকেন” (যাকোব ১:৫)।
মন্তব্যঃ একে অপরের সঙ্গে প্রার্থনা করা খুব ফলদায়ক! এটি এমন একটি চমত্কার পদ্ধতি যা আপনার বিবাহিত জীবনকে আপনার আশাতীত সাফল্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। ঈশ্বরের সামনে নতজানু হন এবং একে অপরের প্রতি সত্যিকারের ভালবাসার জন্য, ক্ষমার জন্য, শক্তির জন্য, জ্ঞানের জন্যত্সমস্যার সমাধানলাভের জন্য প্রার্থনা করুন। ঈশ্বর উত্তর দেবেনই। আপনি সর্ব প্রকার ভুল-ত্রুটি আপনা-আপনি শুধরে যাবে না, কিন্তু ঈশ্বর আপনার মন এবং আপনার কর্মকাণ্ডকে পরিবর্তন করতে অধিকতর সুযোগ পাবেন।
8. আপনাদের একমত হতে হবে যে বিবাহবিচ্ছেদে সমাধান নেই।
“ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার বিয়োগ না করুক” (মথি ১৯:৬)।
“ব্যভিচার দোষ ব্যতিরেকে যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীলোককে বিবাহ
করে, সে ব্যভিচার করে; এবং যে ব্যক্তি সেই পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে, সেও ব্যভিচার করে”
(মথি ১৯:৯)। “যত দিন স্বামী জীবিত থাকে, তত দিন সধবা স্ত্রী ব্যবস্থা দ্বারা তাহার কাছে আবদ্ধ থাকে” (রোমীয় ৭:২)।
মন্তব্যঃবাইবেল বলে যে বিবাহ বন্ধন যেন অবিচ্ছেদ্য হয়। কেবলমাত্র ব্যভিচারের ক্ষেত্রেই বিবাহবিচ্ছেদের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু এমন কি তখনও, এটি করতে কেউকে জোর করা কিংবা পরামর্শ দেয়া হয় নি। ক্ষমা করা সর্বদাই বিবাহবিচ্ছেদের চেয়ে শ্রেয়, এমন কি বিবাহে অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রেও।
যখন ঈশ্বর এদনে সর্বপ্রথম বিবাহকার্যটি সম্পন্ন করলেন, তিনি তা আজীবনের জন্যেই করেছিলেন। এভাবে, বিবাহের ব্রতগুলো মেনে চলা একজন ব্যক্তির পক্ষে সবচেয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং বাধ্যতামূলক। কিন্তু মনে রাখবেন ঈশ্বর আমাদের জীবন উন্নত করার জন্য ও আমাদের প্রয়োজন মেটাতে বিবাহকে দিয়েছেন। বিবাহচ্ছেদের চিন্তা মনে আনলে আপনার দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হবার সম্ভাবনা রয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ কোনও সমস্যার সমাধান হতে পারে না বরং নতুন নতুন সমস্যা বাড়ায়ত্অর্থনৈতিক তথা সামাজিক ক্ষেত্রে সমস্য। তাদের সন্তানেরা সব চাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে কারণে ঈশ্বর বিচ্ছেদের চরম পরিপন্থী।
9. পারিবারিক বন্ধনটি দৃঢ় রাখুন।
“ব্যভিচার করিও না” (যাত্রা ২০:১৪)। তাঁহার স্বামীর হৃদয় তাঁহাতে নির্ভর করে, স্বামীর লাভের অভাব হয় না, তিনি জীবনের সমস্ত দিন তাহার উপকার করেন, অপকার করেন না (হিতোপদেশ ৩১:১১, ১২)। “সদাপ্রভু তোমার যৌবনকালীন স্ত্রীর ও তোমার মধ্যে সাক্ষী হইয়াছেন, ফলতঃ তুমি তাহার প্রতি বিশ্বাসঘতকতা করিয়াছ, কিন্তু সে তোমার সখী ও তোমার নিয়মের স্ত্রী” (মালাখি ২:১৪)। সে তোমাকে রক্ষা করিবে দুষ্ট স্ত্রী হইতে, কেননা বারাঙ্গনা দ্বারা অণ্ণাভাব ঘটে, পরস্ত্রী [মনুষ্যের] মহামূল্য প্রাণ মৃগয়া করে। কেহ যদি বক্ষঃস্থলে অগ্নি রাখে, তবে তাহার বস্ত্র কি পুড়িয়া যাইবে না? তদ্রুপ যে প্রতিবাসীর স্ত্রীর কাছে গমন করে; যে তাহাকে স্পর্শ করে, সে অদণ্ডিত থাকবে না (হিতোপদেশ ৬:২৪, ২৫, ২৭, ২৯)।
মন্তব্যঃ ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় কখনও বাইরে আলোচনা করা উচিত্ নয়ত্এমন কি মাতা-পিতার সঙ্গেও নয়। শয়তানই এই প্রকার স্বভাবের উদয় ঘটায়। আপনার ব্যক্তিগত সমস্যাদি আপনি নিজ গৃহেই নিজেরাই সমাধান তকরার চেষ্টা করুন। কেবলমাত্র একজন পুরোহিত কিংবা দাম্পত্য-বিষয়ক পরামর্শদাতা ছাড়া কেউকে অন্তর্ভুক্ত করবেন না। পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার সদিচ্ছা রাখুন। বৈবাহিক সম্বন্ধের আঁড়ালে অন্য কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে জড়াবেন না। কখনই কোনও প্রকার ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন না, কারন ঈশ্বর ব্যভিচারীকে ঘৃণা করেন। কখনও আপনার সঙ্গীকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবেন না, ও একে অন্যকে ছোট করবেন না। ব্যভিচার আপনাকে ও আপনার পরিবারকে দুঃখিত করবে। ঈশ্বর যিনি আমাদের মন, শরীর, এবং অনুভবের কথা জানেন, তিনি বলেন “তুমি ব্যভিচার কোরো না” (যাত্রা ২০:১৪)। যদি প্রেমের অভিনয় শুরু হয়ে থাকে, তাহলে তা এখনই ছেড়ে দিনত্নতুবা এর ছায়া থেকে কখনও বের হতে পারবেন না।
10. ঈশ্বরই প্রেমের বর্ণনা দিয়েছেন; প্রতিদিন এর অভিজ্ঞতা লাভের লক্ষ্য রাখুন।.
“প্রেম চিরসহিষ্ণু, প্রেম মধুর, ঈর্ষা করে না, প্রেম আত্মশ্লাঘা করে না, গর্ব করে না, অশিষ্ঠাচারন করে না, স্বার্থ চেষ্টা করে না, রাগিয়া ওঠে না, অপকার গণনা করে না, অধার্ম্মিকতায় আনন্দ করে না, কিন্তু সত্যের সহিত আনন্দ করে। সকলই বহন করে, সকলই বিশ্বাস করে , সকলই প্রত্যাশা করে, সকলই ধৈর্য্যপূর্ব্বক সহ্য করে” (১ করিন্থীয় ১৩:৪–৭)।
মন্তব্যঃবাইবেলের এই অংশটি ঈশ্বরের মহান প্রেমের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। অংশটি বার বার পড়ুন। এই কথাগুলোকে কি আপনার দাম্পত্য জীবনের অংশ করেছেন? সত্যিকারের ভালোবাসা নিছক ভাবাবেগ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র নীতি যা আপনার দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি দিকে জড়়িত থাকবে। প্রকৃত প্রেম আপনার বৈবাহিক জীবনকে আরও সুখী ও উন্নত করবে, প্রেম ছাড়া বৈবাহিক জীবন দ্রুত বিফল হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
11. স্বরণে রাখবেন যে সমালোচনা ও বিরক্ত করার কারণে ভালোবাসা বিনষ্ট হয়।
“স্বামীরা, তোমরা আপন আপন স্ত্রীকে প্রেম কর, তাহাদের প্রতি কটু ব্যবহার
করিও না, নারীগণ তোমরা আপন আপন স্বামীর বশীভূতা হও, যেমন প্রভুতে উপযুক্ত”
(কলসীয় ৩:১৮, ১৯)। “বরং নির্জন ভুমিতে বাস করা ভাল, তবু বিবাদিনী ও কোপনা স্ত্রীর সঙ্গে বাস
করা ভালো নয়” (হিতোপদেশ ২১:১৯)। “ভারী বৃষ্টির দিনে অবিরত বিন্দুপাত আর বিবাদিনী স্ত্রী উভয়েই সমান” (হিতোপদেশ ২৭:১৫)। “আর তোমার ভ্রাতার চক্ষে যে কুটা আছে তাহাই কেন দেখিতেছ, কিন্তু
তোমার চক্ষে (নিজের) যে কড়িকাট আছে তাহা কেন ভাবিয়া দেখিতেছ না?” (মথি ৭:৩)। “প্রেম চিরসহিষ্ণু, প্রেম মধুর, প্রেম ঈর্ষা করে না, প্রেম আত্মশ্লাঘা করে না, গর্ব্ব করে না” (১ করিন্থীয় ১৩:৪)।
মন্তব্যঃ সঙ্গীর সমালোচনা, বিরক্ত করা, এবং খুঁত ধরা বন্ধ করুন। তার হয়তো অনেক কিছুতে ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু সমালোচনায় কোনও উপকার হবে না। আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে সব কিছু নিখুঁত পেতে আশা করলে আপনার এবং আপনার সঙ্গীর মাঝে তিক্ততা দেখা দিবে। দোষগুলো উপেক্ষা করে গুণগুলো খুঁজুন। নিজের সঙ্গীকে কখনো সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ, কিংবা কোনও কিছু করতে বাধ্য করার চেষ্টা করবেন নাত্তাতে প্রেম বিনষ্ট হবে। কেবল ঈশ্বরই কেউকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। হাস্যরস, হাসি-খুশি মন, দয়ালুভাব, ধৈর্য্য, এবং ভালোবাসা আপনার দাম্পত্য জীবনের বহু সমস্যা মিটিয়ে দিবে। আপনার বিবাহ-সঙ্গীকে ভালো রাখার পরিবর্তে খুশি রাখতে সচেষ্ট হোন, আর ভালো আপনা-আপনিই আসবে। একটি সফল বিবাহিত জীবনের রহস্য একজন সঠিক সঙ্গীকে পাবার উপর নির্ভর করে না, কিন্তু নিজে একজন সঠিক সঙ্গী হওয়ার উপর নির্ভর করে।

12. কোনও কিছুতে বাড়াবাড়ি করবেন না; মিতাচারী হোন।
“আর যে কেহ মল্লযুদ্ধ করে, সে সর্ববিষয়ে ইন্দ্রিয়দমন করে” (১ করিন্থীয় ৯:২৫)। “প্রেম ... স্বার্থ চেষ্টা করে না” (১ করিন্থীয় ১৩:৪, ৫)। “অতএব তুমি ভোজন অথবা পান যাহা কিছুই কর, সমস্ত কিছুই ঈশ্বরের গৌরবার্থে কর”
(১ করিন্থীয় ১০:৩১)। “বরং আমার নিজ দেহকে প্রহার করিয়া দাসত্তে রাখিতেছি” (১ করিন্থীয় ৯:২৭)।
“যদি কেউ কর্ম না করে তবে সে ভোজনও না করুক” (২ থিষলনীকীয় ৩:১০)। “বিবাহ আদরণীয় ও সেই শয্যা বিমল [হউক]” (ইব্রীয় ১৩:৪)। “অতএব পাপ আমাদের মর্ত্যদেহে রাজত্ব না করুক, করিলে তোমরা তাহার অভিলাষ সমূহের আজ্ঞাবহ হইয়া পড়িবে। আর আপন আপন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে অধার্ম্মিকতার অস্ত্ররূপে পাপের কাছে সমর্পণ করিও না” (রোমীয় ৬:১২, ১৩)।
মন্তব্যঃ কোনও কিছুতে বাড়াবাড়ি করলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হবে। একইভাবে কোনও কিছুতে কমতি হলেও তা হবে। ঈশ্বরের সঙ্গে সময় কাটানো, কাজ করা, ভালোবাসা, বিশ্রাম, শরীর-চর্চা, খেলাধুলা, ভোজন, এবং সামাজিক মেলামেশা, ইত্যাদি সুষমভাবে হওয়া উচিত্ নচেত্ কোথাও ভাঙ্গন দেখা দিবে। অতিরিক্ত কাজ, বিশ্রাম, সঠিক খাবার খাওয়া, এবং শরীর-চর্চায় ঘাটতি হলে মানুষ কুটিলমনা, অসহিষ্ণু, এবং নেতিবাচক হতে থাকে। তাছাড়া বাইবেল একটি পরিমিত যৌন জীবনের সুপারিশ করে (১ করিন্থীয় ৭:৩–৬) কারণ বিকৃত এবং অমিতাচারী যৌনতা একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানকে ধ্বংস করে দেয়। সামাজিক সম্পর্কেরও খুবই প্রয়োজন; এককীত্বে সত্যিকারের সুখ পাওয়া যায় না। আমাদেরকে অবশ্যই প্রাণভরে হাসতে ও আনন্দ উপভোগ করতে হবে। সর্বদা গম্ভীর হয়ে থাকা বিপজ্জনক। কোনও কিছুতে বাড়াবাড়ি করা কিংবা ঘাটতি রাখা মন, শরীর, বিবেক, এবং এক অপরকে ভালোবাসা এবং সম্মান করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আপনার দাম্পত্য জীবনটি অমিতাচার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিবেন না।
13. একে অপরের ব্যক্তিগত অধিকার ও গোপনীয়তাকে শ্রদ্ধা করুন।
“প্রেম চিরসহিষ্ণু, প্রেম মধুর, ঈর্ষা করে না ... অশিষ্টাচরণ করে না, স্বার্থ চেষ্টা করে না ...
অধার্মিকতায় আনন্দ করে না ... সকলই বিশ্বাস করে, সকলই প্রত্যাশা করে, সকলই ধৈর্যপূর্বক সহ্য করে”
(১ করিন্থীয় ১৩:৪–৭)। “ভ্রাতৃপ্রেমে পরস্পর স্নেহশীল হও, সমাদরে একজন অন্যজনকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কর”
(রোমীয় ১২:১০)।
মন্তব্যঃ ত্যেক স্বামী-স্ত্রীকে ঈশ্বর কিছু কিছু ব্যক্তিগত বিষয় বজায় রাখবার স্বাধীনতা দিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই স্বরণে রাখতে হবে যে, ব্যক্তিগত বিষয়াদির উপর কেউ কোনও প্রকার হস্তক্ষেপ করবেন না, যতক্ষণ না অধিকার দেওয়া হয়। ব্যক্তিস্বত্বাকে ক্ষুণ্ণ করা অপরাধ। ঈশ্বরদত্ত ব্যক্তিত্বকে পরিবর্তন করার প্রয়াস অনুচিত, এতে সম্পর্ক নষ্ট হয়। কখনও ব্যক্তিগত চরিত্রকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না। একমাত্র ঈশ্বরই পারেন পরিবর্তন করতে। এই কারণে ক্রমাগত একে অপরের পেছনে লেগে থাকবেন না। উভয়কে উভয়ের প্রতি আস্থাশীল থাকতে হবে প্রেম ও বিশ্বাসে। এতেই পারিবারিক সুখ বৃদ্ধি পায়। ধৈর্য্যপূর্বক সকল পরিস্থিতিতে ঈশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে প্রেমের পরিমণ্ডলে সাংসারিক জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আপনার বিবাহ-সঙ্গীকে “বোঝার জন্য” সময় কম কাটান, এবং তাকে খুশি করার জন্য বেশি সময় কাটান। ফলাফল দেখে আপনি আশ্চর্য্য হবেন।

14. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শালীন, সুশৃঙ্খল, এবং কর্তব্যপরায়ণ হোন।
“পুরুষেরা বিনা ক্রোধে ও বিনা বির্তকে শুচি হস্ত তুলিয়া প্রার্থনা করুক। সেই প্রকারে নারীগণও সলজ্জ ও সুবুদ্ধিভাবে পরিপাটি বেশে আপনাদিগকে ভূষিত করুক” (১ তীমথিয় ২:৯)। “তিনি মেষলোম ও মসীনা অন্বেষণ করেন, প্রফুল্লভাবে আপন হস্তে কর্ম করেন, তিনি রাত্রি থাকিতে ওঠেন ও নিজ পরিজনদের খাদ্য দেন। তিনি আপন পরিবারের আচরণের প্রতি লক্ষ্য রাখেন, তিনি আলস্যের খাদ্য খান না” (হিতোপদেশ ৩১:১৩, ১৫, ২৭)। “অশুচি কোনও বস্তু স্পর্শ করিও না, উহার মধ্য হইতে বাহির হও, হে সদাপ্রভুর পত্রবাহকগন, তোমরা বিশুদ্ধ হও” (যিশাইয় ৫২:১১)। কিন্তু সকলই শিষ্ট ও সুনিয়মিতরূপে করা হউক” (১ করিন্থীয় ১৪:৪০)। “কিন্তু কেহ যদি আপনার সমপর্কীয় লোকদের বিশেষতঃ নিজ পরিজনগণের জন্য চিন্তা না করে, তাহা হইলে সে বিশ্বাস অস্বীকার করিয়াছে, এবং অবিশ্বাসী অপেক্ষা অধম হইয়াছে” (১ তীমথিয় ৫:৮)। “যেন তোমরা শিথিল না হও, কিন্তু যাহারা বিশ্বাস ও দীর্ঘসহিষ্ণুতা দ্বারা প্রতিজ্ঞা সমূহের দায়াধিকারী
তাহাদের অনুকারী হও” (ইব্রীয় ৬:১২)।
মন্তব্যঃশয়তানের দ্বারা বহন করে আনা অলসতা এবং বিশৃঙ্খলা আপনাদের একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্নেহ নষ্ট করে, এভাবে সংসারে ধ্বংস ডেকে আনে। শালীন পোশাক, পরিষ্কার-পরিছন্ন শরীর স্বামী স্ত্রী দুজনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাইবেল অনুসারে নারী-পুরুষ উভয়কেই স্বচ্ছ, উদ্যমী, মৃদুশীল, কর্তব্যপরায়ণ ও ধৈর্য্যশীল হতে হবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একত্রে সহভাগীতায় গৃহ তথা নিজেদের জীবনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে উদ্যমী হতে হবে। স্বার্থপরতাকে পরিহার করে ঈশ্বর বর্ণিত পথে সাংসারিক জীবনকে উন্নততর করতে হবে। যারা অলস তারা পরিবারে বিভিন্ন সমস্যা আনে এবং ঈশ্বরের প্রতিও অসন্তোষ আনে। একে অপরকে সযত্নে এবং সশ্রদ্ধায় দেখভাল করা দরকার। আপাতদৃষ্টিতে ছোট-ছোট বিষয়ে অমনোযোগ বহু সংসারকে বিচ্ছিন্ন করেছে এমনও অনেক উদাহরণ আছে।
15. মৃদু ও মধুর স্বরে কথা বলতে মনস্থ করুন।
“কোমল উত্তর ক্রোধ নিবারণ করে, কিন্তু কটুবাক্য ক্রোধ উত্তেজিত করে”
(হিতোপদেশ ১৫:১)। প্রিয়া ভার্য্যার সহিত সুখে জীবন-যাপন কর” (উপদেশক ৯:৯)।
“আমি যখন শিশু ছিলাম, শিশুর ন্যায় কথা কহিতাম, শিশুর ন্যায় চিন্তা করিতাম, শিশুর ন্যায় বিচার করিতাম; এখন মানুষ হইয়াছি বলিয়া শিশুভাবগুলি ত্যাগ করিয়াছি” (১ করিন্থীয় ১৩:১১)।
মন্তব্যঃ সর্বদা মৃদুভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন জীবন-সঙ্গীর সঙ্গে এমনকি চরম দুর্দশাতে ও ক্রোধান্বিত হয় কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তা সর্বদা ক্ষতিকারক হয়। সে কারণে কথা বলার সময় সংযত হয়ে প্রেমপূর্বক কথা বলতে হবে। কথা বলার আগে ক্রোধকে ঠাণ্ডা করুন। অন্যথায় আপনার জীবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি আপনাকে খুশি করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলবে।



